বন্ধ হোক ফসলে রাসায়নিকের ব্যাবহার

বিংশ শতাব্দীতে কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধিতে প্রধান নিয়ামক হিসেবে কীটনাশকের/রাসায়নিক ব্যবহারকে একমাত্র উপায় হিসেবে কৃষিতে ব্যাবহার বিস্তৃতি ঘটেছে বলে মনে করা হয়।

উন্নত বিশ্বে নিমের নির্যাশ থেকে প্রাকৃতিকভাবে উৎপন্ন কীটনাশক পোকামাকড়ের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়। নিকোটিন ভিত্তিক কীটনাশক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডাসহ বৈশ্বিকভাবে অদ্যাবধি ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়নভূক্ত দেশসমূহে এ ধরনের কীটনাশকের ব্যবহার নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

বিশ্বজুড়ে প্রায় ৮৫ কোটি মানুষ চরম দারিদ্র্যের কারণে ক্ষুধার্ত মানুষের তালিকায় রয়েছেন। এবং প্রায় ২০০ কোটি মানুষ দারিদ্র্যের কারণে খাদ্য নিরাপত্তা ছাড়াই জীবন যাপন করছেন করছেন। (তথ্য সূত্র : বিশ্ব খাদ্য সংস্থা, ২০০৩)

সারা বিশ্বের মানুষের খাদ্য চাহিদা মিটানোর তাগিদে বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন কৃষি ওষুধ ব্যবহার করেছেন বিভিন্ন ফসলে উচ্চ ফলন পাওয়ার জন্য, ফসল বৃদ্ধি করার জন্য আধুনিক চাষাবাদে ব্যবহার করা হচ্ছে হরেক রকমের কীটনাশক, সার প্রয়োগ এবং প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান উন্নয়নের মাধ্যমে ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটানোর নির্মম চেষ্টা আজ আমাদের সামনে উঠে আসছে ক্যান্সার নামক ভয়ঙ্কর রোগের জন্ম দিয়ে, এই কীটনাশক ব্যবহারের কারণে পরিবেশের ভারসাম্যহীনতা সহ জীব বৈচিত্র্যের ধ্বংসাযজ্ঞ দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং মানব স্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক ও বিরূপ প্রভাব ফেলছে।

বাংলাদেশ ব্যাবহ্ত ৫০% কীটনাশক উচ্চ মাত্রার ক্ষতিকর হিসেবে লিপিবদ্ধ যেটা কে ইংলিশ বলা হয় “Very Hazardous”

কীটনাশকের সঠিক ব্যাবহারের প্রশিক্ষন পেয়েছেন মাত্র ৪% শতাংশ কৃষক
আশ্চর্য জনক হলেও সত্য মাত্র ৮৭% শতাংশ কৃষক স্বীকার করেছেন কীটনাশক ব্যবহার করার সময় তারা তেমন কোন সুরক্ষা মূলক বাবস্থা গ্রহন করেন না, ৬% শতাংশ কৃষক প্রতিরক্ষা মূলক যে উপায় টি ব্যবহার করেন সেটি সুদু মাত্র মুখ ঢেকে, ৭৪% শতাংশ কোন প্রকার সুরক্ষা কবজ ব্যবহার করেন না

এবার আসুন জেনে নেই পরিবেশ, কৃষক, এবং আমরা কিভাবে ক্ষতি গ্রস্থ্য হচ্ছি

কৃষক সঠিক ব্যাবহার না জানার কারণে তৎক্ষণাৎ কীটনাশকের বিষক্রিয়া ও ক্ষতিকর গ্যাস গ্রহণ করছেন শ্বাসপ্রশ্বাস গ্রহণের সময়। অন্য দিকে বিষাক্ত কীটনাশকের প্রভাব ফসলের গা থেকে নিস্কৃয় হওয়ার আগে সেই ফসল চলে আসছে বাজার এবং আমরা খাদ্য তালিকায় গ্রহণ করছি স্বল্প পরিসরে নিত্যদিন।

আধুনিক কৃষি চর্চা শুরুর পর থেকে মাটিতে মৌলিক উপাদানের ঘাটতি দেখা দিয়েছে কয়েক দশক পূর্বে। গবেষণায় দেখা গেছে ১৯৫১ সালে বাংলাদেশের মাটিতে নাইট্রোজেনের ঘাটতির সমস্যা। ১৯৫৭ সাল থেকে ঘাটতির তালিকায় নাইট্রোজেনের সাথে ফসফরাস ও যুক্ত হয়। ১৯৬০ সালে তালিকায় পটাশিয়াম ও যুক্ত হয়। ১৯৮০ সাল থেকে সালফারের ঘাটতি তালিকায় যুক্ত হয়। আমরা এখন ২০১৯ সালের পৃথিবীর ছোট্ট একটি দেশ বাংলাদেশের বাসিন্দা আরো কয়েক দশক পার হলে এই দেশে মাটি শুধু নামেই মাটি থাকবে কোনো গুনাগুন থাকবে বলে আমার মনে হয় না. ছেলে বেলা স্কুলে মাটির প্রকারভেদ পড়েছি আমরা সকলে সেই প্রকারভেদের মাটি ও খুঁজে পাওয়া দায় হয়ে দাঁড়াবে। যখন মাটির গুনাগুন পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে বাধ্য হয়ে কীর্তিম রাসায়নিকের তৈরী পুষ্টি গুন্ মাটিতে অধিক মাত্রায় ব্যবহার করতে হবে এবং সেই মাটি থেকে আহরণ করা সবজি, ফসল, ফলমূল, আমাদের স্বাবাবিক জীবনকে বিষিয়ে তুলবে রোগাক্রান্ত করে.

যেসব রোগের মূল কারণ হিসাবে বিশ্ব স্বাস্থ সংস্থা কীটনাশকের ব্যাবহার করা কে দায়ী করে মত প্রকাশ করছে তার নিম্নরূপ

১.হডকিন্সের লিম্ফোমা,
২.লিউকেমিয়া,
৩.ফুসফুসের ক্যান্সার,
৪.এপ্লাস্টিক এনিমিয়া,
৪.ভ্রূণের মৃত্যু,
৫.হরমোন পরিবর্তন,
৬.ডিএনএ ক্ষতি,
৭.জন্মের ত্রুটি এবং
৮.অস্বাভাবিক শুক্রাণু তৈরী হওয়া বা কমে যাওয়া।

সাধারণত ফসলের জমিতে দুই প্রজাতির পোকা এবং জীবের উপস্থিতি থাকে। এদের একপ্রজতি সবজি খেয়ে থাকে এবং অন্য প্রজাতি সবজি খাদকদের খেয়ে থাকে। এটি একটি প্রাকৃতিক চক্র। কিন্তু আমরা কীটনাশক প্রয়োগ করে এই দুই প্রজাতিকে ধ্বংস করে আসছি কয়েক দশক ধরে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের ফলে পোকার অনেক প্রজাতি কীটনাশকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী ক্ষমতা ধীরে ধীরে অর্জন করে। অধিক মাত্রায় কীটনাশক পরিবেশ, প্রাণী জগৎ এবং মানব দেহের জন্য ক্ষতিকর


সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পোকা মাকড় নিধন করার কারণে যুক্তরাজ্যভিত্তিক রাসেল আইপিএমের সুনাম বেশ ছড়িয়ে পড়েছে। সমন্বিত বালাই দমন ব্যবস্থাপনায় রাসেল আইপিএমের বিজ্ঞানীরা গত ৫ বছর ধরে ইউরোপ, আফ্রিকা দক্ষিণপূর্ব এশিয়া এবং ভূমধ্যসাগরীয় এলাকায় এ নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে ফলের মাছি পোকা দমন করে আসছেন। তাদের এ পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি যুক্তরাজ্য সরকার অনুমোদন করে ২০১১-২০১২ সনে তাদের কুইনস পুরস্কারে ভূষিত করেছেন।

১৯৮৪ সালের ভোপালের বিপর্যয় কে অনেকেই ইতিহাসের সর্ব নিকৃষ্ট শিল্প বিপর্যয় বলে আখ্যা দিয়েছেন। ভারতের অঙ্গ রাজ্য মধ্য প্রদেশে অবস্থিত ভোপাল শহরের প্রাণ কেন্দ্রে অবস্থিত ইউনিয়ন কার্বাইড ইন্ডিয়া লিমিটেড (বর্তমানে এভারেডি ইন্ডাস্ট্রিজ ইন্ডিয়া লিমিটেড নামে পরিচিত) এর একটি কীটনাশক তৈরীর কারখানা থেকে দুর্ঘটনাবশত ৪০ টন মিথাইল আইসোসায়ানেট (MIC) বাতাসের সঙ্গে পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে ঘুমন্ত ভোপাল শহরে। এই বিপর্যয় ঘটে ১৯৮৪ সালের ৩রা ডিসেম্বর ভোরে, একটি ট্যাংকের রক্ষিত MIC অতিরিক্ত উত্তপ্ত হয়ে পড়ে এবং বাতাসের চেয়ে ভারী গ্যাস আকারে মাটি ঘেঁষে বের হয়ে আশেপাশের রাস্তা ঘাটে ছড়িয়ে পড়ে। এতে ৩,৭৮৭ ভোপাল বাসীর মৃত্যু ঘটে। শহরের পরিবহন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে এবং বহু লোক পালাতে গিয়ে পদপিষ্ট হন।


মধ্য প্রদেশ সরকারের তথ্য অনুযায়ী ভোপালে গ্যাস লিকের ফলে ৫,৫৮,১২৫ আহত হয়েছিল যার মধ্যে প্রায় ৩,৯০০ গুরুতর এবং স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বহন করছেন।

জেনে নিন বাংলাদেশে কি পরিমানে কীটনাশক ব্যবহার করা হয় প্রতি বছর
  • ২০০৮ সালে ৪১৬০০ টন ব্যবহার করা হয়েছিল
  • ২০১৩ সালে ৩৯২৫০ টন ব্যবহার করা হয়েছিল
২০১৪ সালে বাংলাদেশ সরকার খাদ্য নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করে যার ফলে বাংলাদেশী অনেক প্রতিষ্ঠান জৈব-কীটনাশক উৎপাদন এবং আমদানি করার জন্য উঠে পরে লেগেছিল। প্রশ্ন হচ্ছে আসলে কি জৈব-কীটনাশক আমদানিকারকরা কৃষকের হাতে তুলে দিচ্ছেন নাকি জৈব-কীটনাশকের নাম করে বিষধর কীটনাশক বাজারজাত করছেন?

সাধারণ হিসাব ৪০টন কয়েক ঘন্টার ব্যাবধানে ৩,৭৮৭ জনকে মৃত্যু বরণ করতে হয়েছিল। ৫,৫৪,২২৫ জনকে গুরুতর আহত এবং ৩,৯০০জনকে চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয়েছিল মাত্র ৪০ টনের রাসায়নিক বিক্রিয়ার কারণে।

২০১৩ সালে ৩৯২৫০ টন ব্যবহার করা হয়েছিল বাংলাদেশে। এইবার ৩৬৫ দিন দিয়ে ভগ্নাংশ বের করুন প্রতিদিন কি পরিমান রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়েছে বাংলাদেশের পরিবেশ এবং শাক-সবজি ও ফসলের জমিতে? ১০৭.৫৩ টন সত্যি দেখতে পাচ্ছেন আৎকে উঠার কোনো কারণ নেই এটাই সত্যি। সারা দুনিয়া জুড়ে ভোপালের বিপর্যয় কে অনেকেই ইতিহাসের সর্ব নিকৃষ্ট শিল্প বিপর্যয় বলে আখ্যা দিয়েছেন, ভোপালের ৪০ টনের ভয়াবহতা প্রকাশ পেয়েছিলো তৎক্ষণাৎ দুর্ঘটনার কারণে। বাংলাদেশ প্রতিদিন ১০৭,৫৩ টন ব্যবহার করে জাতীকে ধ্বংস করা হচ্ছে ধীর গতিতে,

এখনই উদ্ধোগ নিতে হবে কৃষক, সমাজ, এবং সরকারকে তবেই জাতিকে রক্ষা করা সম্ভব।
বন্ধ হোক ফসলে রাসায়নিকের ব্যাবহার বন্ধ হোক ফসলে রাসায়নিকের ব্যাবহার Reviewed by জননী এগ্রো / নৈতিক কলাম on জুলাই ২৩, ২০১৯ Rating: 5

কোন মন্তব্য নেই:

Blogger দ্বারা পরিচালিত.